মানুষ কোথায় থাকে?
মানুষ কোথায় থাকে?

মানুষ কোথায় থাকে?

মানুষ কোথায় থাকে? প্রশ্নটা শুনলেই মনে হতে পারে প্রাথমিক শিক্ষা বইয়ের পাতা থেকে তুলে আনা বোকা বোকা কোনো শিশুতোষ প্রশ্ন। তাই না? কিন্তু যদি একটু জোড় দিয়ে বলি ভেবে উত্তরটা বলতে তাহলে আপনি কোন উত্তরটা দেবেন? একটু ভেবে দেখবেন কি? 

উত্তর দেবেন নাকি পাল্টা প্রশ্ন করবেন? নাকি অবজ্ঞার সুরে তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে বলবেন আরে এ কোনো প্রশ্ন হলো নাকি; এ তো সবারই জানা ‘মানুষ বাসায় থাকে’। নাকি একটু রাশভারী কণ্ঠে বলবেন, মশাই কোন যুগের কথা বলছেন? প্রস্তরযুগ, বরফ যুগ নাকি গুহা যুগের কথা জানতে চাইছেন?

আবার চতুর বলবেন, মানুষের যেখানে যখন কাজ তখন মানুষ সেখানে অবস্থান করেন। ধরেন মশাই, মানুষ নিজের বাড়িতে থাকে, আবার অফিস-আদালতে থাকে, ছুটির দিনে বিনোদন কেন্দ্রে থাকে। শ্বশুর বাড়ি যায়, বন্ধুর বাড়িতে যায় কত জায়গাতেই তো থাকে এর কি হিসাব হয় নাকি?

পন্ডিত লোকে বলবেন, মানুষ জন্মের আগে মাতৃগর্ভে থাকে, জন্মের পর ধারিত্রীতে থাকে, তারপর মৃত্যুর পর ভবলীলা সাঙ্গ করে চলে যায়। বিশ্বাসী লোকে হয়তো বলে উঠবে, আরে নাহ্ নাহ্ জন্মের আগে মানুষ ঈশ্বরেরর কাছে থাকেন, জন্মের পর ধারিত্রীতে আর মৃত্যুর পর আবার ঈশ্বরের কাছে ফিরে যান।

যাক! সে অনেক কথা-অনেক আলোচনা। সেসব অলিগলি না ঘুরে আসুন নিজেরাই একটু ভেবে দেখি কোনো সমাধানে আশা যায় কিনা। এই যে আপনি পড়ছেন আপনি কি শুধুই পড়ছেন? নাকি পাশাপাশি অন্যকিছু ভাবছেন? যদি শুধুমাত্র লেখাটাই পড়তে থাকেন তাহলে এই লেখা আপনার জন্য না। যদি লেখা পড়াবার পাশাপাশি আপনি অন্যকিছু ভাবতে থাকেন বা পড়তে পড়তে বিশ্লষণ করতে থাকেন মনে মনে তাহলেই আপনি বিষয়টা বুঝতে পারবেন।

আসলে আমরা বেশিভাগ মানুষই হয় অতিতে থাকি নয়তো ভবিষ্যতে। আমরা বর্তমানে থাকি না বা থাকতে পারি না। ধরুণ আপনি বহুদিনের স্বাদ পূরণ করতে বহু ব্যস্ততার মাঝে সময় বের অনেক চিন্তা-ভাবনা-পরিকল্পনার অবসান করে কোনো এক পূর্ণিমা রাতে চলে গেলেন চাঁদপুরে নদীর তাজা ইলিশ খাবার জন্যে। সঙ্গের সাথীদের নিয়ে গরম গরম ধোয়া উঠা ভাত সদ্য ভাজা ইলিশের টুকরা সাথে তেলে ভাজা শুকনো মরিচ-পেয়াজ দিয়ে যেই না খেতে গেলেন আপনার এক সঙ্গী শুরু করে দিলো গল্প। এর আগে কবে সে ইলিশ ভাজা খেয়েছিল; তা কতো মজা ছিল। সে সময় কি হয়েছিল। আপনারা ইলিশ খেতে খেতে সেই গল্পে মশগুল হয়ে গেলেন। আপনার গল্পও বললেন। বলতে বলতেই হয়তো সেই পরিকল্পনা শুরু করে দিলো আগামীবার আবার কবে আশা হয়ে। সেবার কি কি করা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবেই একসময় সময় শেষে চলে আসতে হয়। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন যে ইলিশ খাওয়ার জন্য এতো সাধনা সেই ইলিশ খাওয়ার সময় সেই স্বাদটাই নিতে পারলেন না। আপনি ডুবে গেলেন অতীতের গল্পে বা ভবিষ্যতের কল্পনায়? আসলে এমনটাই হয় প্রতিনিয়ত। আমরা যখন যেখানে থাকে সেসময় প্রকৃতপক্ষে থাকি না হয় আমরা অতীতে চলে যাই নয়তো ভবিষ্যতে।

এই যে আপনি পড়তে পড়তে কত কিছু ভাবছেন; কত বিচার-বিশ্লেষন করছেন। কত অবন্তর কিছু ভাববেন। আবার কত যৌক্তিক-গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাবছেন। কিন্তু কেবল আপনি এই লেখাটার মাঝে নিজেকে সমর্পন করতে পারছেন না। পূর্ণ স্বজাগ দৃষ্টিতে লেখাটা পড়তে পারছেন না। আসলে আমরা নিজেদের মাথায় এতো সব জটিল সমীকরণ তৈরি করে রেখেছি যে সবকিছুকে জটিল করে তুলি। আর এই জটিলতা আমাদেরকে প্রতিনিয়ত অস্থির করে তোলে। আমরা বর্তমান সময়টাকে উপভোগ করতে পারি না। বুক ভরে নিতে পারি না বর্তমানের সুবাস। অনেকটা ক্যামেরায় তুলে রাখা ছবির মতো। সুন্দর একটা কিছু দেখে আপনি সেটাকে উপভোগ-অনুভব না করে আপনি ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। ভাবলেন মুর্হূতটাকে ধরে রাখলেন। যা অবসরে কখনো দেখবেন। কিন্তু দেখবেন বেশিভাগ ছবিই আর দেখা হয় না বা দেখলেও সেই মুগ্ধতা তৈরি হয় না। হয়তো ছবিটা দেখে অন্য কেউ তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে অন্য কোনো সময়। কিন্তু আপনি মিস করে গেলেন। 

যে অতীত আর পাল্টানো যাবে না আর যে ভবিষ্যত কিভাবে আসবে তা আমরা নিশ্চিত করে জানি না। আমরা তারই পেছনে ছুটতে থাকি প্রতি মুর্হূতে একমুর্হূতও থাকি না বর্তমানে। এই বর্তমানে থাকতে পারলে কি হবে সে আলোচনা অন্য লেখায় লিখবো কোনো সময়। আজ কেবল এই পর্যন্তই মানুষ আসলে থাকে অতীতে বা ভবিষ্যতে। তাই না? তাই কি!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!