কি সন্ধানে যাই সেখানে?
কি সন্ধানে যাই সেখানে?

কি সন্ধানে যাই সেখানে?

ফকির লালন সাঁইজি তাঁর একটি পদে বলেছেন- ‘আমি কি সন্ধানে যাই সেখানে?’ মানুষ কিসের সন্ধান করে তার সমগ্র জীবনে? কিসের সন্ধানে যুবরাজ সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগী হয়ে গৌতম বুদ্ধ হয়? কিসের তাড়নায় মানুষ ঘর ছাড়ে? কিসের তাড়নায় মানুষ ব্যস্ততার মাঝেও উদাস হয়ে যায়? ভাবতে শুরু করে, আমি কে? আমি কোথা থেকে আসলাম? কেনো আসলাম? কি আমার কর্ম? আসলে আমি কি করতে এসেছি? আবার কোথায়ই বা যাব?

এই রহস্যময় জগতের এরূপ অমীমাংসীত প্রশ্নগুলো যখন মাথায় কিলবিল করতে থাকে। যখন সমস্ত কাজ অসার হয়ে আসে তখনই কি মানুষ গৃহত্যাগী হয়? নাকি পূর্ণিমার রাতের বিশেষ যোগে মানুষ থাকতে পারে না গৃহে? দায়ী কি প্রশ্ন নাকি গৃহত্যাগী জ্যোৎস্না? নাকি কোনো শুভক্ষণ? শুভ লগ্ন? 

প্রচলিত আছে উঠতি বয়সে প্রতিটি বাঙালী কবিতা, গৃহত্যাগ ও আত্মহত্যা এই তিন বাসনা বুকে চেপে রাখে গোপনে। তবে বেশিভাগ বাঙালী কবিতা লিখাবার চেষ্টা করেই ক্ষান্ত দেয়। এতো স্বাদের সেই কবিতাও কিন্তু সকলে প্রকাশ্যেও আনতে পারে না। খুব গোপনে গোপন কোনো খাতায় গুপ্ত অবস্থাতেই থেকে যায়। কারো বা আবার কেবল মাথাতেই সীমাবন্ধ থাকে। খাতার পাতাতেও তা স্পষ্ট হয় না। আবার অল্পদিনে সে ইচ্ছাও মরে যায়। আর যাদের এমন বাসনা প্রকাশ্যে উদয় না হলেও বেঁচে থাকে গোপনে। ভেতরে ভেতরে আলোড়ন চলতে থাকে তাদের ভেতরে গৃহত্যাগী ভাব জাগতে শুরু করে। তবে গৃহত্যাগী হওয়া তো আর সহজ কথা নয়। তাই দুই-একবার চেষ্টা করে বাঙালী রণে ভঙ্গ দিয়ে ঘর সংসার করে বাকিটা জীবন সেই সব স্মৃতি রোমন্থন করেই কাটিয়ে দেয়। সবার আর গৌতম বুদ্ধ হওয়া হয় না এক জীবনে।

নেত্রকোণার বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন তার দুই বছর বয়সী সন্তানকে মৃত্যু শয্যায় রেখে এক রাতে গৃহত্যাগ করেন। কালীঘাটের বিখ্যাত কালী সাধক বামাক্ষ্যাপা শৈশবেই গৃহত্যাগ করে কৈলাশপতি বাবা নামে এক সন্ন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সুরের টানে ঘর ছেড়ে কোলকাতায় গিয়ে নাম পরিবর্তন করে গুরুর দ্বারস্থ হন। এইভাবে বলতে গেলে এই তালিকা ফুরাবে না। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতেই থাকবে। আর এই তালিকায় কি শুধু বাঙালীর নাম ঝুলবে? নাহ্! তা মোটেও নয়; সর্বকালে ধারিত্রীর সর্বস্থানেই এমন গৃহত্যাগীর সন্ধান মিলবে। মনের ভেতর বৈরাগ্য ভাব যখন জাগে তখন আর ঘর কাউকে বেঁধে রাখতে পারে না। ঘর তখন আর বন্ধন নয় বন্ধিদশায় পরিণত হয়। সাধারণ মানুষ যখন সকল কাজের শেষে গৃহে ফিরবার স্বপ্নে বিভর হয়ে উঠে তখন কেউ কেউ স্বপ্ন দেখে একদিন বেড়িয়ে পরবে ঘর ছেড়ে। একদিকে যেমন জগতকে জানার উদ্দেশ্যে মানুষ আকাশের তারা দেখে দেখে পাল তোলা জাহাজে বেরিয়ে পরেছে উত্তাল সমুদ্রকে অগ্রাহ্য করে। অন্যদিকে নিজেকে জানার জন্য কত সাধক ঘর ছেড়ে গিয়ে উঠেছে হিমালয়ে। 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনেকে বলেন পর্যটক কবি। বিশ্বের কতশত পথ তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন; কত মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করছেন। তারপরও তিনি লিখেছেন- 

ভেঙে মোর  ঘরের চাবি
নিয়ে যাবি কে আমারে, ও বন্ধু আমার!
না পেয়ে তোমার দেখা, একা একা
দিন যে আমার কাটে না রে॥

আসলে এই সন্ধানের আকুতির কাছে বিশ্বকবি আর পাড়ার যদু-মদু সকলেই এক সারিতে। যখন মাথার ভেতর এই সন্ধানের পোকা চাগাড় দেয় তখন কিছুই করার থাকে না। বেড়িয়ে পরতেই হয় অজানার উদ্দেশ্যে। অল্প সংখ্যকই স্বশরীরে বের হতে পরে বেশিভাগই বেড়িয়ে পরে মনে মনে। সাধকরা বলেন, স্বশরীরে বা মনে মনে যে পথেই হোক; যারা বেড়িয়ে পরে তাদের মধ্যে যারা নিজের ভেতরের নিজেকে সন্ধান করে তারাই তাদের যাত্রা শেষ করতে পারে। এক জনমে না হলেও পারে। কিন্তু যারা জগতে খুঁজতে বের হয় তারা খুঁজতেই থাকে তাদের অনুসন্ধান শেষ হয় না কখনো।

আর খুঁজতে খুঁজতে যারা এ পথের সন্ধান পায় তাদের কেউ কেউ মনসুর হাল্লাজের মতো চিৎকার করতে করতে বলতে শুরু করে দেয়- ‘আমিই সত্য, আমিই সত্য।’ আবার ফকির লালন রচনা করে ফেলেন-

জানতে হয় আদম ছফির আদ্য কথা
না দেখে আজাজিল সেরূপ
কীরূপ আদম গঠলেন সেথা।।

এরমধ্যে কোনটা যে ‘আদম ছফি’ আর কোনটা যে ‘আদ্য কথা’ এই ভেদ বুঝতেই এক জীবন শেষ হয়ে যায় সাধারণের। আসলে আমরা প্রতেক্যেই অজানা এক পথের সন্ধানী। যে পথ কোথা থেকে শুরু হয়েছে কোথায় শেষ হয়েছে আমরা কেউ তা জানি না। সে পথের আদৌ কোনো অস্তিত্ব আছে কিনা, আবার কোথায় সে পথ তাও আমরা প্রায় কেউই নিশ্চিত নই। সকলে নিশ্চিত নই বলাটাও কি সঠিক? কারণ আমাদের মধ্যে কেউ কেউ সে পথের খোঁজ পান বলেও দাবী করেন। তাদের কেউ কেউ আবার নিজেদের মতো করে সেই পথের কথা, সেই পথের সন্ধান পাওয়ার পথ ব্যক্ত করেন। কিন্তু তা এতোটাই গুপ্ত যে তা বোঝা সাধারণের পক্ষে সম্ভব হয় না। আবার বিশ্বাসের বাজারে এতো ধরনের পথের কথা ব্যক্ত করা আছে যে কোনটা যে প্রকৃত পথ তা নির্ণয় করতে করতেই উৎসুখরা জীবনের বেশিভাগ সময় নষ্ট করে ফেলে। অবশ্য শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব বলেছেন, ‘যত মত তত পথ।’ 

আত্মানুসন্ধানীরা বলেন, পরম এক; তা আদি এবং অনন্ত। আর এই পরমকে জানার জন্যই মানবের এই যাত্রা। যাকে ক্ষুদ্রজ্ঞানীরা বলে জীবন। সাধকরা বলেন, এই পরম থেকেই সকল কিছুর সৃষ্টি। সকল সৃষ্টিই পরমের অংশ মাত। আর যা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে তাকে জানার আগ্রহই সে মনের বনে পুষে রাখে জন্ম জন্মান্তর ধরে। আর এই বাসনা থেকেই শুরু হয় সন্ধান। আর এই সন্ধানের যাত্রা যখন শুরু হয় তখন ফকির লালন লিখে ফেলেন- ‘যখন ঐ রুপ স্বরণ হয়, থাকেনা লোক লজ্জার ভয়।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!